কারিমুল হাসান, ধুনট বগুড়া প্রতিনিধি: ২০১০ সাল। জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র বগুড়া পর্বে লাখো দর্শককে কাঁদিয়ে পর্দার সামনে এসেছিলেন এক অদম্য তরুণ কফিল উদ্দিন। তিনি বগুড়ার ধুনট উপজেলার জোড়শিমুল গ্রামের ঈমান আলীর ছেলে।
২০০০ সালে নিজ এলাকা জোরশিমুল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে উত্তির্ণ হয়। পরে সে একই উপজেলার গোসাইবাড়ী ডিগ্রী কলেজে ভর্তি হয়। সাংসারিক আর্থিক সংকটের কারনে লেখাপড়া ছেড়ে চট্টোগ্রামে গিয়ে নির্মাণ শ্রমীকের কাজে যোগ দেয়। কাজরত অবস্থায় বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে মারাত্বক ভাবে আহত হয় কফিল উদ্দীন।
চিকিৎসকদের পরামর্শে দুর্ঘটনায় আহত কফিল উদ্দীনের দুই হাত ও দুই পা কেটে ফেলতে হয়। চিকিৎসা শেষে বাড়ীতে অবস্থান করা কালিন সময়ে ২০০৪ সালের ১৭ জুন কফিল উদ্দিনের বাবা মারা যায়। বাবা মারা যাওয়ার পর তার মা স্থানীয় একটি এনজিও থেকে ঋণ গ্রহন করে।
কফিল উদ্দিন সেই ঋণের টাকায় ২০০৫ সালের জুন মাসের ২২ তারিখে একটি ছোট মুদির দোকান দেন। দোকান পরিচালনার পাশাপাশি আবারও লেখাপড়ার প্রতি অদম্য ইচ্ছা শক্তি জেগে ওঠে কফিল উদ্দিনের। তখন কাটা হাত ও পা দিয়ে লেখার চেষ্টা করতে থাকে কফিল উদ্দিন।
২০০৬ সালে কফিল উদ্দিনের মা স্ট্রোক জনিত কারনে অসুস্থ হন। মায়ের চিকিৎসা ও আর্থিক সংকটের মাঝেও ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষে ধুনট উপজেলার চিকাশী টেকনিক্যাল এন্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজে ভর্তি হয়। ২০১১ সালে উদ্দ্যেক্তা উন্নয়ন ট্রেড থেকে ৪.৬৯ গ্রেড পয়েন্টে উত্তির্ণ হয় কফিল উদ্দিন।
উন্নয়ন উদ্দ্যোক্তা ট্রেডের ফলাফল প্রকাশের আগেই ২০১০ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র বগুড়া পর্বের মাধ্যমে দেশবাসী জানতে পারে বগুড়ার ধুনট উপজেলার জোড়শিমুল গ্রামের কফিল উদ্দিন লেখাপড়া করে একজন বিচারক হবেন। ইত্যাদি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কফিল উদ্দিনকে সহযোগীতা হিসেবে ২ লাখ টাকার চেক প্রদান করে কেয়া কসমেটিকস।
সেই সময়ে সকল দর্শক শ্রতার একটাই বুলি- যে কফিল উদ্দিনের অবিশ্বাস্য জীবন সংগ্রামের গল্প হানিফ সংকেত তার জাদুকরী উপস্থাপনায় কোটি বাঙালির নজরে তুলে ধরেছিলেন, সেই কফিল উদ্দিন কি পারবেন বিচারক হতে? আজ এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে কফিল উদ্দিনের জীবন কেমন কাটছে, তা জানার কৌতূহল এখনো অনেকের।
ইত্যাদির সেই দিন এবং বদলে যাওয়া প্রেক্ষাপট ২০১০ সালের ইত্যাদিতে দেখানো হয়েছিল কফিল উদ্দিন কীভাবে তাঁর শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পায়ের সাহায্যে সব কাজ একা একাই সম্পন্ন করেন। তাঁর সেই প্রতিভা ও মানসিক জোর দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিল গোটা দেশ। ইত্যাদির সেই বিশেষ প্রচারণার পর কফিল উদ্দিন দেশজুড়ে ব্যাপক পরিচিতি পান।
তবে দীর্ঘ এই সময়ে তার জীবন সংগ্রাম মোটেও থেমে থাকেনি। হাত-পা না থাকা এই মানুষটি সময়ের সাথে সাথে নতুন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন, কিন্তু নিজের আত্মবিশ্বাসকে কখনো হারাতে দেননি।বর্তমান জীবনে অদম্য ইচ্ছাশক্তির ওপর ভর করেই বেঁচে আছেন কফিল উদ্দিন। হাত-পা না থাকার গ্লানি ভুলে তিনি পায়ের আঙুলকে হাতের মতো সাবলীল করে তুলেছেন।
নিজের দনন্দিন প্রয়োজনের জন্য মোবাইল ফোন চালানো, খাওয়া-দাওয়া কিংবা অন্যদের সাথে যোগাযোগ রাখার মতো কাজগুলো তিনি এখনো পায়ের সাহায্যেই করে যাচ্ছেন। তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে এবং পারিপার্শ্বিক নানা অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপের কারণে এই অদম্য মানুষটির ˆদনন্দিন লড়াই এখন আরও বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইত্যাদিতে প্রচারের পর সাময়িকভাবে দেশের মানুষের ভালোবাসা ও সহমর্মিতা পেলেও কফিল উদ্দিনের প্রয়োজন স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। সে সময়ে এলাকাবাসী ও সচেতন মহলের মতে, ২০১০ সালে পুরো দেশকে অনুপ্রেরণা দেওয়া এই মানুষটি যেন অবহেলা বা অর্থকষ্টে হারিয়ে না যান।
ছোট ভাই বোন আর অসুস্থ্য মায়ের দেখাশোনাসহ সংসারের দায়িত্ব প্রকৃতির নিয়মেই নিজের কাঁধে আসায় হারিয়ে যেতে থাকে কফিল উদ্দিনের বিচারক হওয়ার স্বপ্ন হয়তোবা বিধির বিধানের লেখা শারীরিক এমন অবস্থার কারনে এখনও বিয়ে করতে পরেনি কফিল উদ্দিন।
সেই ছোট মুদি দোকানটি কিছুটা প্রসারিত করে তিনি এখন নিজ এলাকার জোড়শিমুল বাজারের পুর্ব পাশে মুদি দোকান পরিচালনা করেই চালাচ্ছেন সংসার। দুই কাটা হাতে পরিচালনা করেন দোকান ও মোবাইল ফোন। কৃত্তিম পা লাগিয়েও হাটাচলার চেষ্টা করেছে কফিল উদ্দিন। হারিয়ে গেছে ইত্যাদিতে উঠে আসা তার বিচারক হওয়ার একমাত্র স্বপ্ন।
এবিষয়ে কফিল উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ কারা হলে তিনি জানান, আমার কাটা হাত পা দিয়েই সংসারের যাবতীয় কাজ ও দোকান পরিচালনা করে আসছি। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর কাজের ক্ষেত্রে আমার তেমন কোন প্রতিবন্ধকতায় পরতে হয়না। এক প্রশ্নে জবাবে বলেন, সংসারের অভাব অনাটন আর মা ও ভাই বোনের দেখা শোনার দায়ভারে ২০১০ সালে ইত্যাদিতে উঠে আসা আমার বিচারক হওয়ার স্বপ্ন হারিয়ে গেছে।
তবে এখন আমি আমার ভাই বোনকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি।বিচারকের স্বপ্ন হারানোর পর আমার ভাইবোনের স্বপ্ন পুরন করাটাই আমার স্বপ্ন ছোট ছোট বাটন বা ডিজিটাল টাচ ডিসপ্লে হওয়ার পরে কফিল উদ্দিন কাটা ২ হাতে যেহেতু মোবাইল ফোন চালাতে পারে সেহেতু তিনি কম্পিউটারও চালাতে পারবেন বলে আত্মবিশ্বাস রাখেন।
তিনি বলেন- একটি কম্পিউটারের ব্যবস্থা হলেই আমি প্রশিক্ষনের মাধ্যমে অফলাইনের পাশাপাশি বৈধ অনলাই ভিত্তিক ইনকাম করে আমার সংসার চালাতে পারবো।ধুনটের জোড়শিমুল গ্রামের এই জীবন্ত বিস্ময়কে সম্মানের সাথে টিকিয়ে রাখতে প্রশাসন ও সমাজের বৃত্তবানদের এগিয়ে আসা পয়োজন বলে মনে করেন স্থানীয় অনেকে।