কারিমুল হাসান, ধুনট (বগুড়া) প্রতিনিধি: বর্তমান সিজারিয়ান আধুনিক সভ্যতায় এসেও স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনা করেই স্বাভাবিক সন্তান প্রসব (নরমাল ডেলিভেরী) এর চিন্তা করেন অনেকেই। বিষমণ করে গ্রামীন জনগোষ্টির মধ্যে নরমাল ডেলিভেরীর চাহিদা বরাবরই বেশি।
চিকিৎসা সেবার মান উন্নয়নে গত ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে বগুড়ার ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা তৎকালীন কর্মকর্তা ডা. দিবাকর বসাকের নেতৃত্বে একটি চিকিৎসক দল টিমওয়ার্কের মাধ্যমে স্বাভাবিক প্রসব কার্যক্রম শুরু করে।
প্রসূতিদের স্বাভাবিক প্রসবে উদ্বুদ্ধ করতে বিভিন্ন প্রচারণা জনসচেতনতা সৃষ্টি করা হয়। এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় বগুড়া জেলায় একটি মডেল হিসেবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।
এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দিন দিন বাড়ছে স্বাভাবিক সন্তান প্রসবের (নরমাল ডেলিভারি) সংখ্যা। চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফদের আন্তরিকতা ও দক্ষতার কারণে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রসূতিরা নিরাপদে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সন্তান প্রসব করছেন। দেশজুড়ে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান জন্মদানের জন্য গড়ে উঠছে অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতাল।
সে সকল হাসপাতাল গুলোতে দালালচক্রের মাধ্যমে ভালো চিকিৎসার নাম করে কিংবা বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে গর্ভবতী মা ও তার স্বজনদের সিজার করাতে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে অনেক স্থানে।
অসাদু ব্যবসায়ীদের কারনে যখন অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়য়ের পাশাপাশি অনেক নারী চিরতরে শারীরিক জটিলতার শিকার হচ্ছেন, ঠিক তখনই ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। অহেতুক সিজার বাণিজ্য, দালালচক্র ও অদক্ষ ধাত্রীর হাত থেকে প্রসূতিদের রক্ষা করে নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসব নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানটি।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালে ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪১০ টি, ২০২৩ সালে ৪৮১ টি এবং ২০২৪ সালে ৫২১ টি স্বাভাবিক প্রসব সম্পন্ন হয়। সিজারিয়ান ডেলিভারি কার্যক্রম শুরুর প্রথম বছরে (২০২৪) মাত্র ৩৯টি সিজার সম্পন্ন হয়েছিল, যেখানে নরমাল ডেলিভারি হয়েছিল ৫২১ টি।
২০২৫ সালেও রেকর্ড ৫২১ টি স্বাভাবিক প্রসবের বিপরীতে সিজার হয়েছে মাত্র ১১৪টি। চলতি বছরের (২০২৬) জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৩৩১ জন শিশুর স্বাভাবিক প্রসব সম্পন্ন হয়েছে। তবে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে ৩০টি শিশুর সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে জন্ম দিতে হয়েছে বলে তথ্য রয়েছে।
সবমিলিয়ে ২০২২ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ২ হাজার ৪১৪টি ডেলিভারি সম্পন্ন হয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ২১৩টি সিজারিয়ান এবং বাকি ২ হাজার ২০১টি স্বাভাবিক প্রসব। এই সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ হাসপাতালটি ১০১ শয্যায় উন্নীত হওয়ার সুসংবাদ পেয়েছে।
যা বগুড়া জেলায় এ যাবৎকালের সেরা অর্জনগুলোর একটি। এমন সুনাম ধুনট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইতিহাসে এটিই প্রথম। ডেলিভারির সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি ডেলিভারি-পরবর্তী মা ও শিশুর সুস্থতার হার শতভাগ হওয়ায় প্রসংসার ভাসছে এই প্রতিষ্ঠানটি।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাজ্জাদ কাদির শামিম জানান, প্রসূতি মায়েদের সুবিধার্থে হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে ‘প্রসূতি দাওয়াত কার্ড’ প্রদান করা হয়েছিল এবং বর্তমানে একটি হটলাইন চালু রয়েছে। যার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পরামর্শ, চিকিৎসা ও আল্ট্রাসনোগ্রামের সুযোগ পাওয়া যায়।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেলিভারির সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে, আর আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করি নরমাল ডেলিভারি নিশ্চিত করতে। কারণ নিরাপদে এই ডেলিভারি সম্পন্ন হলে মা ও শিশুর মৃত্যুঝুঁকি থাকে না এবং সাধারণ মানুষ অনেক আর্থিক ব্যয় থেকেও রক্ষা পায়।