জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না, লালমনিরহাট জেলা প্রতিনিধি: লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলায় যৌতুকের লোভ ও বিকারগ্রস্ত মানসিকতার এক মর্মান্তিক ও পৈশাচিক চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। যৌতুকের দাবিতে এক অসহায় গৃহবধূর শরীরের সংবেদনশীল স্থানে অ্যাসিড দিয়ে ঝলসে দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে আদালত ভুক্তভোগী নারীর পক্ষে রায় প্রদান করে ৫ লাখ ৪২ হাজার ৫০০ টাকা ক্ষতিপূরণ আদায়ের নির্দেশ দিলেও, প্রধান অভিযুক্ত স্বামী এখনো আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) এই মামলার ২য় আসামিকে আদিতমারী থানা পুলিশ গ্রেফতার করে জেলহাজতে প্রেরন করেছে। মামলার বিবরণী ও আদালতের নথিপত্র থেকে জানা যায়, ভুক্তভোগী মোছাঃ আমেনা খাতুন (২০), যিনি একজন সহজ-সরল স্বভাবের নারী, তার সাথে ২০১৬ সালের ২৫ অক্টোবর মুসলিম শরিয়ত মোতাবেক মো. আফজাল হোসেন (২৪)-এর বিবাহ সম্পন্ন হয়।
বিয়ের সময় ৫ লাখ টাকার দেনমোহরের মধ্যে নগদ ১৫০০ টাকা পরিশোধ করা হলেও কাবিননামার বাকি ৪ লাখ ৯৮ হাজার ৫০০ টাকা বাকী রাখে। এদিকে পাষন্ড স্বামী ৩ লাখ টাকা যৌতুকের জন্য আমেনার ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন শুরু করে। পরবর্তীতে মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে গরিব বাবা বিভিন্নভাবে ধারদর্জ করে ৫০ হাজার টাকা প্রদান করেন।
কিন্তু লোভী স্বামীর ক্ষুধা তাতেও মেটেনি। ২০১৭ সালের ২ মার্চ দিবাগত রাত আনুমানিক ১১টার দিকে খাওয়ার ঘরে আমেনার কাছে আরও আড়াই লাখ টাকা যৌতুক দাবি করা হয়। আমেনা তার বাবার বাড়ি থেকে টাকা এনে দিতে অস্বীকার করলে পাষণ্ড স্বামী মোঃ আফজাল হোসেন গায়ে পরনের কাপড় তুলিয়া বোতলে থাকা অ্যাসিড আমেনার যৌননাঙ্গে নিক্ষেপ করেন।
এতে আমেনা মারাত্মকভাবে ঝলসে গিয়ে চিৎকার শুরু করেন। এ সময় অন্য আসামিরা ঘরের দরজা খুলে দেয় এবং আমেনার মুখ চেপে ধরে লাঠি ও হাত দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারধর করে চুল ধরে ঘর থেকে বের করে দেয়।
ঘটনার পরদিন সকালে স্বজনরা আমেনাকে অত্যন্ত সংকটজনক অবস্থায় উদ্ধার করে স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নেন। পরবর্তীতে অবস্থার অবনতি হলে তাকে লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ প্রথমে টালবাহানা করে এবং পরবর্তীতে আদালতে আশ্রয়ের পরামর্শ দেয়।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়েরের পর দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ায় আদালত গত ২০২৩ সালের ৬ মার্চ আসামির অনুপস্থিতিতে (একতরফাভাবে) মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে বকেয়া দেনমোহর ও ভরণপোষণ বাবদ মোট ৫ লক্ষ ৪২ হাজার ৫শত টাকা প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসী জানান, এই পৈশাচিক ঘটনার মূল হোতা মোঃ আফজাল হোসেন দীর্ঘদিন ধরে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। আদালতের রায় ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রধান আসামি ঘুরে বেড়াচ্ছেন, যা ভুক্তভোগী পরিবারকে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ফেলেছে।