স্টাফ রিপোর্টার নওগাঁ :
পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে কোরবানির পশুর চামড়া কিনে এবার চরম অনিশ্চয়তা ও লোকসানের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীরা। প্রতি বছর ঈদের পরপরই স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা চামড়া পাইকার ও ট্যানারি প্রতিনিধিদের কাছে বিক্রি করে কিছুটা লাভের মুখ দেখলেও এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। চামড়া কেনার পর থেকে পাইকারদের কোনো খোঁজ না থাকায় হাজার হাজার চামড়া লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করে রাখতে বাধ্য হয়েছেন তারা।
ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদের আগে বিভিন্ন পাইকার ও ট্যানারি প্রতিনিধিরা চামড়া কেনার আশ্বাস দিয়েছিলেন। সেই আশ্বাসের ভিত্তিতেই তারা লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে চামড়া সংগ্রহ করেন। কিন্তু ঈদের পর চামড়া হাতে পাওয়ার পর থেকেই পাইকারদের সঙ্গে যোগাযোগ করা গেলেও তারা কোনো স্পষ্ট জবাব দিচ্ছেন না। ফলে চামড়ার বিশাল মজুদ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।
উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে এবার বিভিন্ন আকার ও মানের গরুর চামড়া ৪০০ থেকে ৯০০ টাকা দরে কিনেছেন মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। সাধারণত এসব চামড়া দ্রুত পাইকারদের কাছে বিক্রি হয়ে যায়। কিন্তু এবার বাজারে ক্রেতার সংকট দেখা দেওয়ায় চামড়া সংরক্ষণই এখন তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চামড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থেকে রক্ষা করতে ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত খরচ করে লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণ করছেন। তাদের দাবি, প্রতিটি চামড়া সংরক্ষণে গড়ে প্রায় ২৫০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। এর সঙ্গে ঈদ উপলক্ষে লবণের দামও বস্তাপ্রতি প্রায় ১০০ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় লোকসানের আশঙ্কা আরও বেড়েছে।
উপজেলার কুবড়াতলী গ্রামের এক মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ী জানান, তিনি এ বছর প্রায় তিন হাজার গরুর চামড়া সংগ্রহ করেছেন। প্রতি বছর দুই-এক দিনের মধ্যেই এসব চামড়া বিক্রি হয়ে গেলেও এবার কোনো পাইকার বা ট্যানারি প্রতিনিধি যোগাযোগ করেননি। বাধ্য হয়ে তিনি খোলা জায়গায় পলিথিন টাঙিয়ে লবণযুক্ত অবস্থায় চামড়াগুলো সংরক্ষণ করছেন।
একই গ্রামের আরেক ব্যবসায়ী মোতালেব হোসেন বলেন, প্রায় ৮০০ গরুর চামড়া কিনে তিনি এখন বড় ধরনের সংকটে পড়েছেন। একটি চামড়াও বিক্রি করতে না পারায় তার পুঁজি আটকে গেছে। এদিকে গরুর চামড়ার পাশাপাশি ছাগলের চামড়ার বাজার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। হরিশপুর গ্রামের ব্যবসায়ী মহাতাব হোসেন জানান, এ বছর খাসির চামড়া কেনার মতো কোনো ক্রেতা পাওয়া যায়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই গরুর চামড়া কিনতে আসা ব্যবসায়ীদের কাছে ছাগলের চামড়া বিনামূল্যে দিয়ে দিতে হয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, মাঠপর্যায়ে চামড়ার বাজার কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে সরকারি মূল্য নির্ধারণ থাকলেও তার কোনো বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ বছর ঢাকার বাইরে গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করলেও রাণীনগরে সেই দামে চামড়া বিক্রির সুযোগই তৈরি হয়নি। পাইকার না থাকায় সরকারি মূল্য শুধু কাগজ কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
এ বিষয়ে রাণীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাকিবুল হাসান বলেন, চামড়া যাতে নষ্ট না হয় সেজন্য প্রশাসন সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে। চামড়া সংরক্ষণে উপজেলার প্রায় ১১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫টন লবণ বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ঈদের আগেই মৌসুমী ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চামড়া সংরক্ষণের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলেন, দ্রুত চামড়া বিক্রির ব্যবস্থা না হলে এবারের ঈদে চামড়া ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অনেকেই বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন।