কারিমুল হাসান, ধুনট (বগুড়া) প্রতিনিধি: তাপপ্রবাহ আর ডেঙ্গুর প্রকোপে বগুড়ার ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীর ভিড় বেড়েছে কয়েক গুণ। গত পাঁচ দিনে ডায়রিয়া, ডেঙ্গু ও গরমজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন অন্তত ১২১ জন। যার মধ্যে ডায়রিয়ায় ৬৭ জন, ডেঙ্গুতে ৪১ জন এবং পানিশূন্যতা, পেটব্যথা, জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্টে আরও ১৩ জন। এই আকস্মিক রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।
গত বৃহস্পতিবার (৩০ আগষ্টা) ওই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি ছিলেন ৬৭ জন রোগী। যা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রোগী ধারন সক্ষমতার চেয়ে বেশি। শয্যা না পেয়ে অনেক রোগীকে থাকতে হচ্ছে মেঝে ও বারান্দায়। যেখানে একদিকে যেমন গরমের প্রকোপ অন্যদিকে নেই বৈদ্যুতিক পাখার ব্যবস্থা। ফলে বাড়তি ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগী ও স্বজনরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রোগী অভিযোগ করে নিজের বরাতে বলেন, তিনদিন ধরেিআমাকে বারান্দায় রাখা হয়েছিলো।
বিদ্যুৎ নেই, ফ্যানও নেই। গরম আর পেটব্যথায় একেবারে নাকাল অবস্থা। একটু ভালো জায়গা আর চিকিৎসার ঠিকঠাক ব্যবস্থা করলে সুস্থ হতে পারতাম। আরো এক রোগীর স্বজন অভিযোগ করে বলেন, হাসপাতালে বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য জেনারেটর আছে কিনা জানিনা, বিদ্যুৎ চলে গেলে গরমে কষ্ট আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত এক রোগী জানান, চিকিৎসা চলছে। কিন্তু ডেঙ্গু আর ডায়রিয়া রোগী একই সঙ্গে একই ওয়ার্ডে থাকার কারণে নিজের সুস্থতা নিয়ে শঙ্কিত রয়েছি।
আরো জানা যায় যে, ওয়ার্ডের পাশে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা না থাকায় হাসপাতালের নিচে গিয়ে টিউবওয়েল থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। এতে রোগী একা রেখে পানি আনতে অনেকটা কষ্ট করতে হচ্ছে রোগীর স্বজনদের। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ও আরএমওসহ ৩৩টি পদের ১৫টি এবং জুনিয়র বিশেষজ্ঞের ১০টি পদের ৬টি শূন্য, জরুরি বিভাগেও নেই কোনো নির্ধারিত চিকিৎসক।
ফলে কিছু ক্ষেত্রে বহির্বিভাগ ও জরুরী বিভাগে শিশুসহ বিভিন্ন বিভাগে রোগী দেখছেন উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল চিকিৎসক। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সংকট আরও ভয়াবহ, ১০৭টি তৃতীয় শ্রেণির পদের মধ্যে কর্মরত মাত্র ৬৭ জন, আর ২৯টি চতুর্থ শ্রেণির পদের বিপরীতে আছেন মাত্র ৭ জন। এক্ষেত্রে এজনকে একাধিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এছাড়াও হাসপাতালে নেই কোনো পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ওটি বয়, ওয়ার্ড বয়, টিকিট ক্লার্ক কিংবা নিরাপত্তা প্রহরীও।
জনশ্রুতি আছে, ওয়ার্ডে দিনে একবারের বেশি আসেন না চিকিৎসক। ডাকলেও সহজে দেখা মেলেনা নার্সদের। অনেকে মনে করেন, সরকারের ঘোষনা অনুযায়ী এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি করে পরিপূর্ণভাবে ১০০ শয্যায় উন্নীত করে জেনারেটরের মাধ্যমে বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতকরণ হলে সেবার মান আরো তরান্বিত হবে।
উপজেলা পরিসংখ্যান বিভাগের কর্মকর্তা মোহাম্মদ বাপ্পি জানান, ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার লাখো মানুষের একমাত্র ভরসাস্থল ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। যেখানে মাসে গড়ে ১২ থেকে ১৩ হাজার রোগী সেবা গ্রহন করে। কিন্তু জনবল সংকট ও সীমিত সুযোগ-সুবিধার কারণে জটিল রোগীদের প্রায়ই রেফার করতে হয় বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে। কখনো কখনো বেসরকারি ক্লিনিকেও যেতে হয় রোগীদের।
এ বিষয়ে ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মো. নাজমুল হোসেন বলেন, এখানে গড়ে প্রতিদিন আউটডোর ও ইনডোর মিলিয়ে ৪০০-৫০০ রোগী সেবা গ্রহন করে। দীর্ঘদিন নিয়োগ প্রক্রিয়া না হওয়ায় প্রয়োজনের তুলনায় কিছুটা জনবল সংকট তৈরি হয়েছে। শুধু আশঙ্কাজনক রোগীদের অন্যত্র রেফার করা হয় এবং বাকি সবাইকে ভর্তি রেখেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
ডেঙ্গু ও ডায়রিয়া রোগীদের একসঙ্গে রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, এটা কোনো সমস্যা হবে না, আমরা পৃথকভাবে চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করছি। জায়গার স্বল্পতার কারণে সাময়িকভাবে এভাবে চালিয়ে নিতে হচ্ছে। বাইরে চিকিৎসাধীন অনেককে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, আপাতত বাইরে কোনো রোগী নেই।
গত বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সাজ্জাদুল কাদির এর সাথে দেখা করতে গেলে তাকে হাসপাতালে পাওয়া যায়নি। পরে তার অফিসিয়াল ও ব্যক্তিগত মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া মেলেনি।