ভার্সিটিতে পড়ি। সেকেন্ড ইয়ার। নতুন একটা টিউশনি পেলাম। ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের দিকের গেট দিয়ে বের হলে বকশীবাজার। মিনিট দুয়েক হাঁটলে উমেশ দত্ত রোডের মুখে নবকুমার ইন্সটিটিউট ও ড. শহিদুল্লাহ কলেজের সাইনবোর্ড। গলিতে ঢুকলে পুরাতন কিছু বাড়ি। এর একটি শাদিদদের। এর আগেও ইংলিশ মিডিয়ামের বেশ কয়েকজনকে পড়িয়েছি। দুনিয়াতে তখনও ইন্টারনেট অতটা জেঁকে বসেনি। তখনও ফেসবুক ইউটিউব এ• ইন্সটাগ্রাম আবিষ্কার হয়নি।

 

ঐ সময়েও ওরা ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ, লন টেনিস, ইংলিশ সিরিজ দেখে। পশ্চিমাদের নিয়ে চর্চা করে। ইংরেজি কমিক, গল্পের বই পড়ে। ইংরজি মাধ্যম পড়ুয়ারা ভিন্ন মাইন্ডসেট নিয়ে বেড়ে উঠে। আমাদের সাথে ঠিক যায় না। এদেশে থাকলেও মন পড়ে থাকে অন্য কোথাও। নতুন ছাত্রও ওরকমই হবে।

 

কিন্ত শাদিদ ছিলো অন্য রকম। ও তখন ক্লাশ থ্রিতে পড়ে (ক্লাশ ফাইভ পর্যন্ত পড়াই)। বেশ শান্ত, অত্যন্ত বিনয়ী। আমার কাছে গল্প শুনতে চায়। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে ওর সাথে গল্প করি। দেশের জন্মের ইতিহাসের গল্প শোনাই, হুমায়ুন আহমেদ, আক্তারুজ্জামান ইলিয়াসদের পরিচয় করিয়ে দেই। বাংলাদেশের নাটক, সিনেমা, খেলার আলাপ করি। আমি নিজেও ওকে পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকেই হুমায়ুন আহমেদের জোছনা ও জননীর গল্প পড়ে ফেলি।

 

ওকে বলি, ঠিক আছে ইংরেজি গান শোন। এর পর একফাকে বারি সিদ্দিকী, লালন, রবি কিংবা কিছু নজরুলের গান শোন। এদেশে জন্ম নিয়ে এমাটির হাওয়া বাতাস জলে বড় হয়েও কিছু না জানা বড় ধরনের অন্যায়। আমার কথা শুনে অবাক হতে থাকে। এক পর্যায়ে ও একটু একটু করে বুঝতে শেখে। একটু একটু করে গান শোনে, দেশের খেলার খবর নেয়। ওর ভালো লাগে। ওসব দেখে খুব তৃপ্তি পাই।

 

শাদিদের বাবা ব্যবসায়ী ছিলেন, মা প্রশাসনে চাকরি করেন। দুজনই ব্যস্ত মানুষ। প্রায় ৩ বছর পড়িয়েছি। ওর বাবা মা ওর পরিবর্তন নিশ্চয় খেয়াল করেন। ওসব বিষয়ে কখনও কিছু বলেন নি। আমার ধারনা, ওনারা অখুশি ছিলেন না। আমি সাজিদ, ছাত্রের নাম শাদিদ। দুজনের নাম খুব কাছাকছি। ওর মা সালমা অ্যান্টি ডাকতেন, শাদিদ।

 

আমি শুনতে পেতাম সাজিদ। আমাকে আবার কেন ডাকে? শাদিদ হাসে। ও জানায় আমাকে নয়, ওকে ডেকেছে। নামের ভিতরে ‘জ’ ও ‘দ’ এর ফারাক বুঝতে প্রায় ভুল হত। ওকে শেষ পড়িয়েছি ২০ বছর আগে। এখন নিশ্চয় অনেক বড় হয়ে গেছে। ও ছিল আমার অত্যন্ত প্রিয়। ভালো থাকুক শাদিদ।

 

ওকে ইংরেজি সাহিত্য পড়াচ্ছি। বলছি, সেক্সপিয়ারের । শাদিদ হাসছে।স্যার, সেক্সপিয়ার নয়, উচ্চারণ হবে শেক্সপিয়ার। ও হাসে, আমি লজ্জায় পড়ি। এরকম অনেক ভুল উচ্চারন ওর কাছ থেকে সঠিকটা শিখেছি। আজ সাফিনের হাতের শেক্সপিয়ারের পোস্টার শাদিদের স্মৃতি মনে করিয়ে দিছে।

লেখক-
মো: সাজিদ রহমান
কর্মকর্তা, সড়ক বিভাগ, ঢাকা।

 

বিডি নিউজ বাংলা ২৪ ডটকম