অনলাইন ডেস্কঃ
জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাবে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে বিশ্বের ১৭টি অঞ্চল পৃথিবীর মানচিত্র থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (IPCC)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২১০০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৩২ থেকে ৮৪ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এই পরিবর্তন অনেক নিচু দ্বীপরাষ্ট্র ও উপকূলীয় শহরের জন্য অস্তিত্বের সংকট তৈরি করবে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য জেরুজালেম পোস্ট-এ প্রকাশিত গবেষণার সারসংক্ষেপে সংকটাপন্ন অঞ্চলগুলোর এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
অস্তিত্বের চরম ঝুঁকিতে থাকা দ্বীপরাষ্ট্রসমূহ
মালদ্বীপ: বিশ্বের সর্বনিম্ন উচ্চতার এই দেশটিতে সমুদ্রের উচ্চতা বাড়ার কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে এর ১,১০০টি দ্বীপের প্রায় ৮০ শতাংশই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।
টুভালু ও কিরিবাতি: টুভালুর প্রায় ৯৫ শতাংশ এলাকা ২১০০ সালের মধ্যে পুরোপুরি প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে, কিরিবাতিতে সমুদ্রের উচ্চতা বিশ্বব্যাপী গড়ের চেয়ে চারগুণ দ্রুত বাড়ছে।
মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ ও সলোমন দ্বীপপুঞ্জ: এই অঞ্চলের অনেক দ্বীপের অস্তিত্ব ইতিমধ্যেই সংকটে পড়েছে এবং এগুলো সমুদ্রের নিচে তলিয়ে যেতে শুরু করেছে।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে:এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ বাংলাদেশ তার মোট ভূখণ্ডের প্রায় ১৭ শতাংশ হারাতে পারে।
গণ-বাস্তুচ্যুতি: উপকূলীয় অঞ্চল তলিয়ে যাওয়ার ফলে প্রায় ২০ মিলিয়ন (২ কোটি) মানুষ নিজেদের ভিটেমাটি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
কৃষি ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়: জমিতে লবণাক্ত পানি প্রবেশ এবং ঘন ঘন তীব্র ঝড়ের কারণে দেশের সামগ্রিক কৃষি কাজ ব্যাহত হচ্ছে, যা মানুষকে বাধ্য করছে এলাকা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে।
ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বখ্যাত শহর ও উন্নত দেশসমূহ
শুধু গরিব বা দ্বীপরাষ্ট্রই নয়, এই তালিকায় রয়েছে বিশ্বের বেশ কিছু উন্নত ও বিখ্যাত অঞ্চলও:
ভেনিস (ইতালি): পর্যটকদের অন্যতম প্রিয় এই ঐতিহাসিক শহরটি প্রতি বছর ১ থেকে ২ মিলিমিটার করে তলিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই শহরটি ১৮টি ভয়াবহ বন্যার সম্মুখীন হয়েছে।
মিয়ামি (যুক্তরাষ্ট্র): ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে শহরটি নিচু এলাকা এবং ছিদ্রযুক্ত চুনাপাথরের ওপর গঠিত। ফলে সমুদ্রের পানি নিচ থেকে উঠে এসে শহরটিতে দীর্ঘমেয়াদী বন্যার ঝুঁকি তৈরি করছে।
নেদারল্যান্ডস: বিশ্বের অন্যতম উন্নত প্রযুক্তির এই দেশটির চারভাগের একভাগ এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে অবস্থিত এবং দেশের ৬০ শতাংশ মানুষ চরম বন্যার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছেন।
তালিকায় থাকা অন্যান্য অঞ্চলসমূহ: নাউরু, টরেস প্রণালী দ্বীপপুঞ্জ, পালাউ, ভানুয়াতু, সেশেলস, সামোয়া, ফিজি এবং বাহামাস।
ভবিষ্যৎ প্রভাব: বদলে যাবে ভূরাজনীতি
প্রতিবেদনের শেষভাগে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, এই ১৭টি অঞ্চল যদি পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায়, তবে গোটা বিশ্বের জীববৈচিত্রে এক অপূরণীয় ক্ষতি ও পরিবর্তন ঘটবে, যা পরিবেশের ধ্বংসকে আরও ত্বরান্বিত করবে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের এই আকস্মিক পরিবর্তন কেবল পৃথিবীর মানচিত্র বা ভূরাজনীতিই বদলে দেবে না, বরং লাখ লাখ মানুষের জীবন, জীবিকা এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে এক চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেবে। বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই বিপর্যয় এড়ানো অসম্ভব।