নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হওয়ার আলোচনা ঘিরে দলটির পরবর্তী মহাসচিব কে হচ্ছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ।
দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্রের দাবি, বড় ধরনের কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন না হলে রিজভীকেই বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো দলীয়ভাবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা, গ্রেপ্তার ও কারাবরণের মধ্য দিয়ে বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকা রিজভীকে দলের তৃণমূল থেকে কেন্দ্র – সব পর্যায়েই পরিচিত ও পরীক্ষিত নেতা হিসেবে দেখা হয়। বিশেষ করে দলের কঠিন সময়ে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থান করে নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং দলীয় কার্যক্রম সচল রাখার কারণে তার প্রতি একটি শক্তিশালী আস্থার জায়গা তৈরি হয়েছে।
দলীয় সূত্রের ভাষ্য, এক-এগারোর সময় থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়েও রিজভী নানা মামলা ও রাজনৈতিক হয়রানির মুখে পড়েছেন। একাধিকবার কারাবরণ করেও দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি তিনি।
কঠিন সময়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব
২০১৮ সাল থেকে ২০২০ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থান করে দলীয় কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে রিজভীর রাজনৈতিক দৃঢ়তার অন্যতম উদাহরণ হিসেবে আলোচিত।
এ ছাড়া ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে বিএনপির অনেক নেতা আত্মগোপনে চলে গেলেও রিজভী বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাধা ও গ্রেপ্তারের ঝুঁকি উপেক্ষা করে বিভিন্ন কর্মসূচিতে তার অংশগ্রহণও দলের ভেতরে প্রশংসিত হয়েছে।
ছাত্ররাজনীতি থেকে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে
রুহুল কবির রিজভীর রাজনৈতিক উত্থান ছাত্ররাজনীতির মধ্য দিয়ে। আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তিনি। ১৯৮৪ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়।
১৯৮৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনে ভিপি নির্বাচিত হন রিজভী। পরে ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে উঠে আসেন এবং বর্তমানে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তারেক রহমানের আস্থার জায়গায় রিজভী?
বিএনপির ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্রের দাবি, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য মহাসচিবের পছন্দের তালিকায় রুহুল কবির রিজভীর নাম রয়েছে শীর্ষে।
দলীয় গঠনতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী প্রথমে তাকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া এবং পরে জাতীয় কাউন্সিলে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নির্বাচনের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা চলছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার মতে, দীর্ঘদিনের ত্যাগ, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং প্রতিকূল সময়ে দলের পাশে থাকার অভিজ্ঞতা রিজভীকে এই পদের জন্য শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে এগিয়ে রেখেছে।
কী বলছেন রিজভী?
তবে মহাসচিব হওয়ার বিষয়ে রুহুল কবির রিজভী নিজে কোনো নিশ্চিত বক্তব্য দেননি। তিনি বলেন, মহাসচিব পদ নিয়ে কী হচ্ছে, আমার জানা নেই। তবে আমি দলের প্রতি শতভাগ আনুগত্য প্রকাশ করেই কাজ করছি। রিজভী আরও বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নির্দেশেই তিনি দীর্ঘদিন দলের নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন এবং সেই দায়িত্ব এখনো পালন করে যাচ্ছেন।
দল তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে, সেটি বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং দলের নীতিনির্ধারকরাই সিদ্ধান্ত নেবেন বলেও জানান তিনি।
জাতীয় কাউন্সিলেই কি আসবে ঘোষণা?
দলীয় ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি, নভেম্বরের শেষ দিকে অথবা ডিসেম্বর মাসে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হলে সেখানেই দলের পরবর্তী মহাসচিবের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হতে পারে।
সব মিলিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হওয়ার আলোচনা সামনে আসার পর বিএনপির মহাসচিব পদে রুহুল কবির রিজভীর নামই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত। তবে শেষ পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্ত কার পক্ষে যায়, তা নির্ধারণ হবে বিএনপির আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ও জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে।