আব্দুর রউফ রিপন নওগাঁ জেলা প্রতিনিধিঃ
উচ্চ আদালতে মামলার জট কমাতে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের গরীব-অসহায় মানুষের দোরগোড়ায় সহজে বিচারিক সুবিধা পৌঁছে দিতে সরকার দেশব্যাপী গ্রাম আদালত কার্যক্রম চালু করেছে। লক্ষ্য ছিল ছোট ছোট ফৌজদারি বিষয়গুলো স্থানীয়ভাবে দ্রুত নিষ্পত্তি করা। কিন্তু বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহার ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) গ্রাম আদালত এখন এর উল্টো চিত্রে রূপ নিয়েছে। সাধারণ মানুষের আস্থার পরিবর্তে এই আদালতটি এখন অনিয়ম, দালালি আর চরম হয়রানির আখড়ায় পরিণত হয়েছে বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে গ্রাম আদালতের নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো অভিযোগ সর্বোচ্চ ৯০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এছাড়া এই আদালতের জমি সংক্রান্ত জটিল বিরোধ নিষ্পত্তির কোনো আইনি এখতিয়ার নেই। অথচ সান্তাহার ইউপির গ্রাম আদালতের প্রতিনিধিরা অর্থ আয়ের ভালো উৎস হিসেবে জমি সংক্রান্ত অভিযোগগুলো লুফে নিচ্ছেন। অভিযোগ নিষ্পত্তির দায়িত্ব যখনই ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার ও স্থানীয় নেতাদের ওপর দেওয়া হচ্ছে, তখনই তারা এটিকে দ্রুত শেষ না করে আয়ের উৎস বানিয়ে মাসের পর মাস ঝুলিয়ে রাখছেন। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে আদালতের প্রতিনিধি ও স্থানীয় নেতারা একতরফা পক্ষ নেওয়ায় চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন অসহায় মানুষ। সম্প্রতি এমন একটি চাঞ্চল্যকর অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে ওই ইউনিয়নের দড়িয়াপুর গ্রাম।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায় আদমদীঘি উপজেলার শেষ সীমানায় অবস্থিত অবহেলিত গ্রাম দড়িয়াপুর। এই গ্রামের বাসিন্দা মৃত আমজাদ হোসেন মাস্টারের ছেলে ও স্থানীয় সাংবাদিক আব্দুর রউফ সান্তাহার ইউপি গ্রাম আদালতে দায়ের করা মাত্র এক শতাংশ জমির একটি মিথ্যা অভিযোগের জেরে চরম হয়রানির শিকার হয়েছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে একই গ্রামের মৃত আজাদ মিস্ত্রির স্ত্রী ফিরোজা ১৯৮০ সালে বিক্রি হওয়া ১ শতাংশ জমি আমজাদ হোসেনের কাছে পাবেন দাবি করে গত বছরের অক্টোবর মাসে একটি অভিযোগ দায়ের করেন। অথচ আমজাদ হোসেন ২০২৪ সালে মারা যাওয়ার আগে দীর্ঘ ৪৪ বছরেও বাদীপক্ষ কখনো এই জমি দাবি করেনি। সান্তাহার ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তাজ উদ্দিনের সহযোগিতায় এই অভিযোগটি করা হয়।অভিযোগের পর সান্তাহার ইউপির প্যানেল চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন (যিনি বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে এলাকায় ‘ভিভিআইপি চেয়ারম্যান’ হিসেবে পরিচিত) গত বছরের ১০ নভেম্বর গ্রামে জমি জরিপের জন্য প্রথম বৈঠক ডাকেন। প্রথম দিন সমাধান না হওয়ায় দফায় দফায় কখনো ইউনিয়ন পরিষদে, আবার কখনো গ্রামে বৈঠক বসানো হয়। ভুক্তভোগী জানান, প্রতিবার বৈঠকের নামে ইউপি প্রতিনিধিদের মোটা অঙ্কের সম্মানী ও যাতায়াত বাবদ জ্বালানি খরচ দিতে বাধ্য করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ ৭ মাস ধরে বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখে বাদীপক্ষ ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার সাইদুল ইসলাম ও স্থানীয় বিএনপি নেতা তাজ উদ্দিনের সঙ্গে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বিবাদীর জমি কেড়ে নেওয়ার চুক্তি করে। গত মার্চ মাসে বিবাদী আব্দুর রউফ তার নিজ খরচে খারিজ সম্পন্ন করা রাস্তার পাশের অন্য দাগের জায়গায় সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করতে গেলে বাদীপক্ষ বাধা দেয়। বিষয়টি ইউপি চেয়ারম্যানকে জানানো হলে তিনি নিজেই বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন বাদীর দাবি ৩১ দাগে তাহলে তারা অন্য দাগের জমি কেন দাবি করছে?
পরবর্তীতে গত এপ্রিল মাসে চেয়ারম্যান বিষয়টি সমাধানের জন্য মেম্বার সাইদুল, সাংবাদিক ও বিএনপি নেতা তাজ উদ্দিনকে দায়িত্ব দেন। মে মাসের শুরুতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ও বিবাদী পক্ষের সার্ভেয়ারকে কোনো সুযোগ না দিয়ে, তাজ উদ্দিনের দলবল একটি ভুয়া সীমানা নির্ধারণ করে। পরে প্যানেল চেয়ারম্যান এসে তাজ উদ্দিনের পূর্বপরিকল্পিত নকশা অনুযায়ী বিবাদীর ২০০৪ সালের ক্রয়কৃত বৈধ জমির ভেতরে প্রবেশ করে প্রায় ২ হাত জমি বাদীকে ছেড়ে দেওয়ার একতরফা রায় প্রদান করেন। বিবাদী আব্দুর রউফ বিএনপি নেতা তাজ উদ্দিনের অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় এই অন্যায্য রায়ের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
এই বিষয়ে রাণীনগর দলিল লেখক সমিতির অন্যতম সদস্য ও দলিল বিশেষজ্ঞ মোখলেছুর রহমান মুহুরী জানান সিএস এমআরআর আরএস খতিয়ান ও খারিজ অনুসারে আব্দুর রউফের অংশের জমি এবং দখল সম্পূর্ণ ঠিক আছে। বরং আব্দুর রউফের পিতার ক্রয় করা সম্পত্তির কিছু জমি এখনো বাদী পক্ষই অবৈধভাবে দখল করে আছে। সার্ভেয়ার মোস্তাক, বিএনপি নেতা তাজ ও মেম্বার সাইদুল ইসলামের অনৈতিক আঁতাতের কারণেই অন্যায়ভাবে বিবাদীর জমি বাদীপক্ষকে দেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগী আব্দুর রউফ জানান, দালালের অর্থের বিনিময়ে তৈরি করা ছকের ওপর ভিত্তি করে গ্রাম আদালতের বিচারকের এমন রায় অত্যন্ত হতাশাজনক। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরকারিভাবে জমি জরিপ ও সঠিক বিচার পেতে তিনি দ্রুতই সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের দ্বারস্থ হবেন।
জানতে চাইলে সান্তাহার ইউপির প্যানেল চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন বলেনএকজন চেয়ারম্যানকে অনেক কাজ করতে হয় তাই প্রতিটি বিচারে সরেজমিনে যাওয়া সম্ভব হয় না। সে কারণেই দলীয় নেতা তাজ উদ্দিনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে জমি সংক্রান্ত এই বিষয়টি দীর্ঘ সময় পর কোনো হয়রানি ছাড়াই সমাধান করা হয়েছে।কোনো ভুক্তভোগী হয়রানির লিখিত অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।এদিকে আদমদীঘি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোছাঃ মাসুমা বেগম স্পষ্ট জানিয়ে দেন গ্রাম আদালত মূলত ফৌজদারি বিষয়ের অভিযোগগুলোই আমলে নিতে পারে। জমি সংক্রান্ত বড় সমস্যা সমাধানের এখতিয়ার তাদের নেই। খুব সামান্য সীমানা বিরোধ হলে দেখতে পারে। গ্রাম আদালতে অভিযোগ দিয়ে কেউ হয়রানির শিকার হলে এবং সেই বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।