নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা : বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়ন প্রায় চূড়ান্ত বলে জানিয়েছে দলটির একাধিক উচ্চপর্যায়ের সূত্র। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর নাম চূড়ান্ত করেছেন বলেও সূত্রগুলো দাবি করেছে।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সম্মতিসূচক লিখিত ঘোষণায় মির্জা ফখরুল স্বাক্ষর করেছেন বলেও দলীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে। যদিও এ বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
এর আগে গত ২ আগস্ট বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই মির্জা ফখরুলের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন থেকে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে। রোববার দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী ইসি কার্যালয় থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন।
ইসি ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৮ আগস্ট। একাধিক প্রার্থী থাকলে আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হবে।
বিরোধী জোটের চ্যালেঞ্জ, প্রার্থী অলি আহমদ, ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুলের নাম প্রায় নিশ্চিত হওয়ার মধ্যেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় বিরোধী জোট।
জোটের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করা হয়েছে বিএনপির সাবেক নেতা ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে। রোববার মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক শেষে এ ঘোষণা দেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, জুলাই সনদ ও রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়ে বিএনপির অবস্থানের কারণে বিরোধী জোট আলাদাভাবে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও দৃশ্যমান করার লক্ষ্য রয়েছে বলেও জানান তিনি।
প্রার্থী মনোনীত হওয়ার পর অলি আহমদ বলেন, তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করায় তিনি ১১-দলীয় জোটের প্রতি কৃতজ্ঞ। একজন মুক্তিযোদ্ধা ও পরীক্ষিত ব্যক্তি হিসেবে দেশের অভিভাবকের দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা তাঁর রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির মহাসচিব কে?
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির মহাসচিব পদটি কার হাতে যাবে এ প্রশ্ন এখন দলের ভেতরে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রায় ১৬ বছর ধরে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন মির্জা ফখরুল। ২০১১ সালে তিনি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। পরে ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলে তাঁকে দলের মহাসচিব নির্বাচিত করা হয়।
দলের কঠিন রাজনৈতিক সময়ে তিনি দীর্ঘদিন বিএনপির নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্ব এবং তারেক রহমানের দেশের বাইরে অবস্থানের সময়ও দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপি প্রথমে একজন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নিয়োগ করতে পারে। পরে জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে নতুন মহাসচিব নির্বাচন করা হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ও যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নাম দলের ভেতরে আলোচনায় রয়েছে। তবে রিজভী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেননি এবং মন্ত্রিসভাতেও নেই। ফলে তাঁকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার সম্ভাবনা বেশি বলে বিএনপির কয়েকজন নেতা মনে করছেন।
২০ আগস্ট ভোট হলে তৈরি হবে নতুন নজির
সংসদীয় গণতন্ত্র চালুর পর ১৯৯১ সালে সর্বশেষ রাষ্ট্রপতি পদে ভোটাভুটি হয়েছিল। এরপর বিরোধী দলগুলো রাষ্ট্রপতি পদে আলাদা প্রার্থী না দেওয়ায় আর ভোটের প্রয়োজন হয়নি। এবার জাতীয় সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও বিরোধী জোট আলাদা প্রার্থী দিয়েছে। ফলে অলি আহমদ প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করলে আগামী ২০ আগস্ট সংসদে ভোট গ্রহণের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটে। প্রত্যেক সংসদ সদস্য একটি করে ভোট দিতে পারেন। কোনো সংসদ সদস্য নিজ দলের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট দিলে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাঁর সংসদ সদস্য পদ শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হওয়ার পর সাংবিধানিক সময়সীমার মধ্যেই নির্বাচন আয়োজন করছে নির্বাচন কমিশন। এরই মধ্যে কমিশন ভোটার তালিকা প্রস্তুতসহ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু করেছে।
সব মিলিয়ে এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে নতুন সমীকরণ। একদিকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত বলে দলীয় সূত্রগুলো দাবি করছে, অন্যদিকে বিরোধী জোটের প্রার্থী হিসেবে অলি আহমদের মাঠে নামা নির্বাচনে যুক্ত করেছে প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন মাত্রা।
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির মহাসচিব পদে কে আসবেন সেই সিদ্ধান্তও তখন দলের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে শুধু বঙ্গভবন নয়, বিএনপির অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নিয়েও শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা।